মনসবদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখো। অথবা, মুঘল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে মনসবদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো। Class 11 second semester

 Q) মনসবদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখো।

 অথবা, মুঘল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে মনসবদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করো।

 উত্তর :  

মনসবদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখো।


ভারতবর্ষে মধ্যযুগে মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক যে সুবিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়, সেখানে তিনি রাজকীয় সেবার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য গঠনের এক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এরই ফলস্বরূপ মনসবদারি ব্যবস্থার সূচনা হয়। এই মনসবদারি ব্যবস্থা আকবর ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে চালু করেন।

(1) মনসব শব্দের অর্থ: মনসব শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল পদমর্যাদা বা Rank। এই পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিরা 'মনসবদার' নামে পরিচিত। তাই বলা যায়, মনসব হল প্রাথমিক অর্থে কোনও ব্যক্তিকে প্রদত্ত মর্যাদা। কালক্রমে এই পদটির সঙ্গে নানাবিধ দায়িত্ব-কর্তব্য যুক্ত হয়।

(2) মনসবদারি প্রথা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য:

(ক) মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনকালের পূর্বেই প্রচলিত জায়গিরদারি ব্যবস্থায় দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটলে আকবর প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য মনসবদারি ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।

(খ) জায়গিরদারি ব্যবস্থায় বেতনের পরিবর্তে জমিদানের নীতি গৃহীত হওয়ায় খালিসা জমির পরিমাণ কমতে থাকে। এর ফলস্বরূপ রাজকোশের আয় কমে যায়। এই প্রেক্ষাপটে সরকারি রাজস্ব ও আয় বৃদ্ধির জন্য সম্রাট আকবর মনসবদারি ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

(গ) এ ছাড়া মুঘল সম্রাট বাবর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যকে সুসংহত রূপ দান করতে এবং সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের সুসংগঠিত করার জন্য আকবর মনসবদারি ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

(3) মনসবদারদের নিয়োগরীতি: বংশানুক্রমিক বা উত্তরাধিকারসূত্রে মনসবদারগণ নিযুক্ত হতেন না। মনসবদার নিয়োগের অধিকারী ছিলেন একমাত্র সম্রাট। তিনি নিজ ইচ্ছানুযায়ী যে-কোনো ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ করতে পারতেন। তবে এক্ষেত্রে সম্রাট উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও শাহজাদাদের পরামর্শকেও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেন।

(4) পদমর্যাদার বিভিন্ন স্তর: 

মনসবদারি ব্যবস্থায় একাধিক স্তরের মনসবদার নিয়োগ করা হত। আবুল ফজল মনসবদারদের তেত্রিশটি স্তরের বিবরণ দিয়েছেন। বস্তুত আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে, আবুল ফজল মনসবদারদের ৬৬টি স্তরের কথা বললেও, বিবরণ দিয়েছেন মাত্র ৩৩টি স্তরের। সর্বনিম্ন মনসবদারের অধীনে ১০জন এবং সর্বোচ্চ মনসবদারের অধীনে ৫ হাজার সৈন্য থাকত। ৬ থেকে ১০ হাজারি মনসবদার পদে রাজপরিবারের সন্তান বা সম্রাটের অতিবিশ্বস্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হত। যেমন- মানসিংহ, আবুল ফজল, টোডরমল প্রমুখ উচ্চপদে নিয়োজিত হয়েছিলেন। ক্রমোচ্চ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সম্রাটের ইচ্ছাই ছিল যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি।

(5) মনসবদারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য: 

মনসবদারদের মূল কাজ ছিল সম্রাটের প্রতি অনুগত থাকা এবং সম্রাটের প্রয়োজন অনুসারে তাঁকে সাহায্য করা। এক্ষেত্রে পদমর্যাদার তারতম্য বিচার্য ছিল না। সামরিক ও অসামরিক উভয় কাজেই মনসবদারদের সেবা (Service) রাষ্ট্র দাবি করতে পারত। সাধারণভাবে মনসবদারগণ সম্রাটের নির্দেশ অনুসারে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেনা ও যুদ্ধের অশ্ব রাখতে দায়বদ্ধ ছিলেন। অধ্যাপক কুরেশী (SM Quareshi)-এর মতে, 'সকল মনসবদারই সামরিক পদমর্যাদা (Rank) পেতেন। তবে সবার জন্য সামরিক কর্তব্য বাধ্যতামূলক ছিল না।'

(6) জাট ও সওয়ার: 

প্রত্যেক মনসবদারকে 'জাট' ও 'সওয়ার' বাহিনী রাখতে হত। 'জাট' ও 'সওয়ার' বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারও কারও মতে, 'জাট' ছিল পদাতিক এবং 'সওয়ার' ছিল অশ্বারোহী বাহিনীর সূচক। অর্থাৎ প্রতিটি মনসবদার তাঁর পদমর্যাদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য রাখতেন এবং সম্রাটের সামরিক প্রয়োজনে সম্রাটকে পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতেন।

(7) 'দাগ' ও 'হুলিয়া' প্রথা: 

মনসবদারি ব্যবস্থায় বহু মনসবদার নির্দিষ্টসংখ্যক সেনা পোষণ করতেন না। ভাড়াটে সেনা দেখিয়ে সরকারি পরিদর্শককে সন্তুষ্ট করে দিতেন। এই ত্রুটি উপলব্ধি করে আকবর দাগ এবং - চেহরা বা হুলিয়া প্রথা চালু করেন। দাগ (Branding) হল, প্রতিটি ঘোড়ার গায়ে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা এবং চেহরা (Descriptive Roll) হল, প্রতিটি সৈনিকের ব্যক্তিগত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা।

(8) বেতন : মনসবদারদের দুই রকম ভাবে বেতন দেওয়া হতো। নগদ অর্থ প্রদান ও জায়গীর প্রদান এর মাধ্যমে।  যাদের নগদে অর্থ প্রদান করা হতো তাদের বলা হত জায়গীরদার-ই-নগদি এবং যাদের জমি বা জায়গীর প্রদান করা হতো তাদের জায়গীরদার নামে পরিচিত। একশো 'জাট' পদাধিকারী মনসবদার ৫০০ টাক বেতন পেতেন। এক হাজারি ও পাঁচ হাজারি মনসবদারদের বেতন ছিল যথাক্রমে ৪,৪০০ ও ৩০,০০০ টাকা

(9) পদন্নোতি ও পদচ্যুতি: 

মনসবদারদের পদন্নোতি এবং পদচ্যুতির বিষয়টি তাদের নিয়োগের মতোই সম্রাটের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল। এ ছাড়া কোনও মনসবদার যদি তার পদমর্যাদা অনুযায়ী কর্তব্যপালনে অসমর্থ হতেন, তাহলে তার পদের অবনতি ঘটানো হত।

          

             সম্রাট আকবর প্রবর্তিত মনসবদারি প্রথা ছিল মুঘল শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভস্বরূপ। সমগ্র মুঘল আমল জুড়েই মূলত এর অস্তিত্ব ছিল। অবশ্য ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের পর, মুঘল প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে মনসবদারি প্রথারও বিলুপ্তি ঘটে।

Comments